'উড়ো জাহাজে' চেপে না ফেরার দেশে পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

© এই সময় এর দ্বারা সরবরাহকৃত

সুদীপ ঘোষ

একে কি সমাপতন বলা যায়?

তাঁর ছবির শুটিং কভার করতে যাব, অনেক দিনের ইচ্ছা। শেষে ২০১৮ সালের গোড়ায় সে সুযোগ মিলল। আর সেই ছবিটাই দুর্ভাগ্যক্রমে হয়ে গেল তাঁর শেষ ছবি। 'উড়োজাহাজ'। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের দৃশ্যকাব্যগুলো যে আর নতুন করে বড় পর্দায় আসবে না, এ কথা এখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। জানতাম তিনি অসুস্থ। ডায়ালিসিস চলছে। কিন্তু আমি যে তাঁর অন্য এক অবতারের সাক্ষী!

'উড়োজাহাজ'-এর শুটিং হয়েছিল টাটানগরের আশপাশে। কখনও ডিমনা লেক পেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে হলুদবনি এলাকায়। কখনও বা আবার আশপাশের অন্য কোনও জায়গায়। কিন্তু দেখার মতো ছিল ডায়ালিসিস চলা সত্তরোর্ধ্ব এক সিনেমা পরিচালকের জীবনীশক্তি। জামশেদপুরের টাটানগরের পাশাপাশি দু'টো হোটেল মিলিয়ে তখন পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আর অভিনেতা-অভিনেত্রী-কলাকুশলী মিলে 'উড়োজাহাজ'-এর পুরো ইউনিট রয়েছে। শুনলাম, হোটেলের কাছাকাছি এক চিকিৎসালয়ে পরিচালকের ডায়ালিসিসের ব্যবস্থা হয়েছে। লম্বা শিডিউল। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কলকাতা যাতায়াত করছেন। কারণ, পরিচালকের ঘনঘন ডায়ালিসিস লাগছে। এবং যেদিন ডায়ালিসিস হচ্ছে, তার পর দিন রোদে, পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে তাঁর পক্ষে শুটিং করা সম্ভব হচ্ছে না।

পৌঁছেছিলাম রাতে। শুনলাম, তার আগের দিনই তাঁর ডায়ালিসিস হয়েছে। সেদিন তাই শুটিং নেই। পরের দিন ভোর থেকে শুটিং। সিনেমা-করিয়েদের ভাষায় ম্যাজিক লাইট নামে একটা বস্তু আছে। সেই আলোটা ভোরের আগে আর বিকেলের পরে পাওয়া যায়। বুদ্ধদেববাবু কিছু বিশেষ দৃশ্য ম্যাজিক লাইটে ক্যামেরাবন্দি করতে ভালোবাসতেন। তাই হয়তো ভোরবেলায় শুটিংয়ের কল-টাইম।

83392779

তবে দুর্বল শরীরে একেবারে ভোরে বেরিয়ে পড়তে পারলেন না। খানিক বেলাই হলো ইউনিটের গাড়ি চালু হতে। সেই গাড়িতে যেতে যেতে শোনা একটা কথা এখনও কানে লেগে আছে। সত্তরোর্ধ্ব পরিচালকের ইউনিটে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের মধ্যে হাতে গোনা ক'জন খালি পঞ্চাশের উত্তর-প্রান্তে৷ সে কারণেই কি দক্ষিণ-পঞ্চাশে থাকা দলের টগবগে তরুণেরা অনুপ্রেরণার জন্য তাকিয়ে থাকছেন দলনেতা পরিচালকের দিকে? 'মনের জোর দাদা,' বলছিলেন তেমনই একজন, মনে আছে৷ 'মনের জোর না-থাকলে এমন অবস্থায় এ ছবি কেউ করতে সাহসই পেত না ৷'

কেন পেত না, সে অবশ্য শুটিং স্পটে গিয়েই বোঝা গেল! জঙ্গলের মধ্যে বেশ খাড়াই এক টিলা। তার উপরই রাখা হয়েছে, ফিল্মের নায়ক বাচ্চুর উড়োজাহাজের সেট। ডুলি-চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারণ, নিজে নিজে ওই টিলায় ওঠা বুদ্ধদেববাবুর পক্ষে সম্ভব নয়। কলাকুশলীরা চারদিক থেকে হাতল ধরে পরিচালককে নিয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন টিলার মাথায়। শুটিং কিন্তু থামছে না। কোন দৃশ্যে ক্যামেরায় কোন লেন্স প্রয়োজন, কোথায় ক্যামেরা বসালে সবচেয়ে ভালো অ্যাঙ্গেলটা পাওয়া যাবে চন্দন (রায় সান্যাল) আর পার্নোর (মিত্র), উড়োজাহাজের সেটের পুঙ্খানুপুঙ্খ ড্রয়িংটা কেমন- এ সব কিছু খুঁটিয়ে দেখছেন বুদ্ধদেববাবু স্বয়ং। তখন কিন্তু কোনও ক্লান্তির ছোঁয়া, কোনও ডায়ালিসিসের জুজু তাঁর ধারেকাছেও নেই।

প্রথম দফা শুটিংয়ের শেষে একটু আলাদা করে কথা বলবার সুযোগ পেলাম। প্রথম প্রশ্নটাই ছিল, এমন ভগ্ন শরীরে শুটিংয়ের ঝামেলায় গেলেন কেন? খুব বিরক্ত হয়েছিলেন প্রশ্নটা শুনে। বলেছিলেন, এ সব নয়, আমায় আমার কাজ নিয়ে প্রশ্ন করো।

83429641

কাজ মানে সিনেমা। অতিমারীর মধ্যেও শুনলাম গোটা একটা নতুন চিত্রনাট্য লিখে ফেলেছিলেন। শুটিং শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। শেষ কথা হয় গত বছর অক্টোবর নাগাদ। তখন বলেছিলেন, 'এই কোভিড তো আর চিরকাল থাকবে না। পরিচালকরা কিন্তু ছবি করেই যাবেন।' সময়কে টপকে গিয়ে জয়ী হওয়া, সেটাই তো হয়ে ওঠে সফল ছবির লক্ষণ। পরিপূর্ণ পরিচালক হয়ে ওঠার স্বাক্ষর।

'উড়ো জাহাজে' চেপে না ফেরার দেশে পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত